খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত গাছিরা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি »

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলা পঞ্জিকা অনুয়ায়ী আজ সোমবার ২৬ আশ্বিন। সেই অনুয়ায়ী শরতের দ্বিতীয় মাস। এরপর শুরু হেমন্তের। হেমন্তের দুই মাস পর শুরু হবে শীতকাল। রৌদ্রজ্জ্বল দিনে এখনও প্রচন্ড গরম অনুভূত হলেও রাতের শেষ ভাগ ও ভোরে শীত অনুভূত হচ্ছে দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায়।

সীমান্তবর্তী এ জেলায় ভারতের হিমালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় হেমন্তের শুরু থেকে আগাম শীতের আগমন ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে কুয়াশা আর ভোরে লতা-পাতা, ঘাস ও আমন ধানের ডগায় শিশির বিন্দু জমে থাকাই বলে দিচ্ছে গ্রামীণ এ জনপদে জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা।

পুরোপুরি শীত শুরু না হতেই গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস আহরণের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গাছগুলো প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতোমধ্যে সব ধরনের উপকরণও সংগ্রহ করছেন গাছিরা।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গিয়ে দেখা গেছে, চাষিরা কোমরে দড়ি, ছেনি, দা বেঁধে নিপুণ হাতে খেজুর গাছগুলো প্রস্তুত করছেন। এ উপজেলায় পতিত জমিতে বাণিজ্যিক ভাবে খেজুর গাছ তেমন না থাকলেও ফসলি জমির আইল ও সড়কের দুই ধারে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেজুরের গাছ লাগিয়েছেন কৃষকরা। জমিতে সবুজ ক্ষেত আর আইলে সারি সারি খেজুর গাছের দৃশ্য যেন মন ভরে যায় প্রকৃতি প্রেমীদের।

উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের উত্তর রাবাইটারী এলাকার দুই ভাই ১০-১৫ দিন ধরে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের জন্য গাছগুলো পরিস্কার করেছেন। বড় ভাই শুক্কুর আলী (৪৫) ও ছোট ভাই সমেজ আলী (৪০)। তাদের বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কলিক এলাকার মৃত মোকছেদ আলী মন্ডলের ছেলে।

শুক্কুর আলী দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এ অঞ্চলে খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করছেন। গুড় বিক্রির আয় দিয়ে জীবন-জীবিকার পাশাপাশি এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন এক ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছেন। সামনে ছেলেটা এসএসসি পরীক্ষা দেবে। শুক্কুর আলী বছরে এ অঞ্চলে চার মাস কাঁটান। এবার ছোট ভাইকে নিয়ে এসেছেন।

ওই এলাকার সামছুল হকের বাগানে খেজুর গাছের ডাল ও পলিথিন দিয়ে তৈরি একটি ছোট ঘরে দুই ভাই থাকেন। খাওয়া-দাওয়া সকাল-দুপুর স্থানীয় বাজারেই খান। রাতে দুই ভাইয়ে রান্না করেই খাওয়া-দাওয়া করেন। এই চার মাস লড়াই সংগ্রাম করেই ঐ এলাকার বিভিন্ন কৃষকের ১৩০টি খেজুর গাছ চুক্তি নিয়ে রস সংগ্রহ করবেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শুক্কুর আলী খেজুরের রস থেকে গুড়-পাটালির চাহিদা থাকায় তিনি প্রতি বছরেই লাভবান হন।

গাছি শুক্কুর আলী (৪৫) বলেন, ৩০ বছর ধরে ফুলবাড়ী এলাকায় খেজুর গাছ চুক্তি নিয়ে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করি। এ বছর ছোট ভাইকে নিয়ে এসেছি। এ বছর ১৩০টি খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করবো। প্রতিটি খেজুর গাছের মালিককে তিন কেজি করে গুড় দিতে হবে। আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহে খেজুর গাছ ঝোড়া শুরু করেছি। সব কিছু ঠিক থাকলে কার্ত্তিক মাসের ১৫-২০ তারিখের মধ্যেই রস সংগ্রহ করা শুরু করতে পারব। চার মাস থাকা খাওয়াসহ সব কিছু খরচ মিটিয়ে প্রতি বছর ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় করি।

উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কুরুষাফেরুষা গ্রামের গাছি আমিনুল ইসলাম ও রেজাউল ইসলাম বলেন, এলাকায় আগের মত আর খেজুর গাছ নেই। অন্যদিকে গাছে রসও কমে যাওয়ায় স্থানীয় গাছিরা রস আহরণের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এ বছর তারা প্রত্যেকেই ৩০-৪০টি খেজুর গাছ চুক্তি নিয়েছি।

তারা আরও বলেন, কৃষকরা পতিত জমির আইল, সড়ক ও পুকুরে ধারে বাণিজ্যিক ভাবে খেজুর গাছ লাগান। প্রতিটি খেজুর গাছে তিন কেজি করে গুড় দেওয়া চুক্তিতে আমরা রস সংগ্রহ করতে আগে ভাগে খেজুর গাছগুলো ঝোড়ার কাজ করছি।

জছিমিয়া সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, আগে শীত মৌসুমে গ্রামে সকালের পরিবেশ নলেন গুড়-পাটালির ঘ্রাণে মৌ মৌ করত। কিন্তু এখন আর সেসব দিন নেই। আগের চেয়ে খেজুর গাছের সংস্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। শীতের সময় শুধু গ্রামই নয় শহরেও খেজুরের রস-গুড় দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা-পুলি, ক্ষির ও পায়েস। ফলে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন কম হওয়ায় গুড়ের দামও অনেক বেশি।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা আসফিয়া শারমিন বলেন, এ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার খেজুর গাছ আছে। তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেজুর বাগান গড়ে তোলা হলে কৃষকরা লাভবান হবেন। কারণ খেজুর গাছের জন্য বাড়তি কোন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা কৃষি বিভাগ কৃষকদের বাড়ির আশপাশে ও পুকুর পাড়ে এবং সড়কের ধারে খেজুর গাছ লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছে।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »