১৬ বছরে একদিনও ক্লাস না নিয়েও শিক্ষক তিনি

পটুয়াখালী প্রতিনিধি »

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দীর্ঘ ১৬ বছরে একদিনের জন্যও ক্লাস না নিয়েও কলেজ শিক্ষক হিসেবে বহাল আছেন। এমন ঘটনা ঘটেছে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী মহিলা ডিগ্রী কলেজে। সেই শিক্ষিকার নাম সালমা বেগম।

বিষয়টি নিয়ে বিব্রত কলেজের শিক্ষক ও গভর্নিং বডির সদস্যরা। কারণ নিয়মিত পাঠদানের শর্তে নিয়োগ পেলেও ২০০৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত একদিনও সালমা বেগম কলেজে আসেননি। ২০১৯ সালে কলেজটি ডিগ্রী স্তরে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর হঠাৎ করে আলোচনায় আসে সালমা বেগমের নাম। শুরু করেন এমপিওভুক্ত হওয়ার চেষ্টা।

কলেজ সূত্র জানায়, এমন ঘটনার পেছনে মূল ভূমিকায় আছেন কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. আবদুর রহমান। কলেজটির ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক আব্দুস সালাম মোল্লা মারা যাওয়ার পর কৌশলে তার ইনডেক্স (নম্বর ৩০০৯০১৩) ব্যবহার করে সাত বছর বেতন ভাতা উত্তোলন করেন অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান ও বাংলা বিভাগের শিক্ষক বীণা পাণি অধিকারী। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে। টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৩ সাল থেকে অধ্যক্ষের এমপিও স্থগিত রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সালমা বেগম ২০০৫ সালে নিয়োগ পাওয়ার দাবি করলেও মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ইএমআইএস সেল, বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তালিকা কোথাও তার নাম নেই। অন্যদিকে এই বিষয়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়মিত পাঠদান, জাতীয় ও উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষকসহ সব শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত আছেন মো. ওয়ালি উদ্দিন। তিনি শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত পাঠদানসহ কলেজের কার্যক্রমে শুরু থেকে যুক্ত থাকার বিষয়টি একাধিক শিক্ষক, গভর্নিং বডির সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি সব কার্যক্রমে যুক্ত থাকলেও কলেজের অধ্যক্ষ তাকে কৌশলে সালমা খাতুনের পরে নিয়োগ দেখিয়েছেন।

শুধু এই ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগেই নয় কলেজটির একাধিক বিষয়ে শিক্ষক এমপিও নিয়ে চলছে যাচ্ছে তাই অবস্থা। দর্শন বিভাগে নিয়মিত শিক্ষক শিউলি আক্তারকে বাদ দিয়ে ডিগ্রী স্তরে শহিদুল ইসলামকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।

কলেজে পাঠদানসহ কোনো কার্যক্রমে অংশ না নেয়ার বিষয়ে কথা বললে সালমা বেগম বলেন, আমি ঢাকায় পরিবার নিয়ে ছিলাম কারণ আমার স্বামী অসুস্থ। প্রায় ১৭ বছর ধরে নিয়োগ পেলেও কোনো বিল ভাতা না পাওয়ায় আমাকে জীবন বাঁচানোর জন্য থাকতে হয়েছে। তার মানে এই না যে কোনোদিন কলেজে যাইনি। প্রিন্সিপাল স্যার যখন বলেছেন তখন কলেজে গিয়েছি।

জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি মাউশির বরিশালের আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক অভিযোগের বিষয় সরেজমিন তদন্ত করেন। সেদিনই প্রথমবারের মতো কলেজে উপস্থিত হয়েছিলেন সালমা বেগম। এদিকে ঢাকায় থাকা সালমার হয়ে শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করেন অধ্যক্ষ। তদন্ত কমিটিও সালমা বেগমসহ একাধিক শিক্ষকের কলেজের কোনো কার্যক্রমে যুক্ত না থাকাসহ নানা অভিযোগের বিষয়ে মাউশিতে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। হাজিরা খাতা ট্যাম্পারিংয়েরও সত্যতা পেয়েছেন তারা।

কলেজ সূত্র বলছে, তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হওয়ার পর আবার ঢাকায় ফিরে আসলেও গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে কলেজে যাওয়া আসা শুরু করেন সালমা। অধ্যক্ষ এই সুযোগ করে দিলেও বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজটির একাধিক শিক্ষক জানান, সালমা বেগমসহ আরও কয়েকজন যে শিক্ষক সেটা ডিগ্রির এমপিও সামনে আসার পর জেনেছি। এদের কোনোদিন কলেজে আমরা দেখিনি। অথচ অধ্যক্ষ এদের এমপিও করানোর চেষ্টা করছেন। আর যারা প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেতন-ভাতা ছাড়া কাজ করছেন তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

এ বিষয়ে কলেজটির অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর পর এমপিও হওয়াতে যত সমস্যার তৈরি হয়েছে। এই ১৫ বছর কেউই তেমন নিয়মিত ছিলো না। তার নিজের বিরুদ্ধে মামলা ও এমপিও বন্ধের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এটি এখন বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।

এদিকে নিয়মিতদের বাদ দিয়ে অনিয়মিত শিক্ষককে এমপিও করার বিষয়টি নিয়ে কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি গাজী আতাহার উদ্দিন আহমেদ বলেন, কলেজটা শুধু এই অনিয়মের জন্য পিছিয়ে আছে। কলেজে ক্লাস করেছেন তাকে বাদ দিয়ে আরেকজনকে এমপিও করা হচ্ছে। আবার এক বিষয়ে শিক্ষক পাবে দুইজন সেখানে তিন-চারজন নিয়োগ দিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সময়।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »