নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল আইনের লঙ্ঘন উদাসিনতা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণােদিত?

নিজস্ব প্রতিবেদক »

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেশের বিভিন্ন জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে আইন লঙ্ঘনের অভিযােগ পাওয়া গেছে। এ কারণে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া অনেক বিচারপ্রার্থী হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

আইনের এই লঙ্ঘন উদাসিনতা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণােদিত, সেই প্রশ্নই আইন বিশেষজ্ঞদের। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী বলেও মনে করেন তারা।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ২৭ ধারার লঙ্ঘন করে বেশি কিছু নালিশি দরখাস্ত (আমলে গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের মতাে) থানা পুলিশকে মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনা-১: হবিগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ এক ভুক্তভােগী আট জনের বিরুদ্ধে নালিশি দরখাস্ত দাখিল করেন (ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর: ২১৪/২১)। পরে বাদির জবানবন্দি গ্রহণ করে অনুসন্ধান ব্যতিত বিচারক জিয়া উদ্দিন মাহমুদ গত ০২ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এফআইআর গ্রহণের আদেশ দেন (থানার মামলা নম্বর- ৩(৯)২১।

আদেশে বলা হয়, নালিশি দরখাস্তটি মামলা হিসেবে রেজিস্ট্রি করা হােক। দরখাস্তকারীর হলফনামা গ্রহণ করা হলাে।

নালিশি দরখাস্ত ও জবানবন্দি পর্যালােচনায় দেখা যায়, এই মামলায় আনিত অভিযােগের প্রাথমিকের সত্যতা আমলযােগ্য। এমতাবস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশােধিত ২০০৩) এর ৯ (৩) তৎসহ দণ্ডবিধি ৩৪২/৩৪৭/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩৮৫/৫০৬(২) ধারায় আট জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করার জন্য থানা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা হলাে। আদেশ প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে মামলা রুজু সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে প্রেরণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলাে।

ঘটনা-২: ঢাকার ৮ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বাদি হয়ে আট জনের বিরুদ্ধে এক নারী একটি নালিশি দরখাস্ত দাখিল করেন (ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর: ১০৮/২০২১)। বাদির জবানবন্দি গ্রহণ করেন বিচারক বেগম। মাফরােজা পারভীন গত ০৬ সেপ্টেম্বর নালিশি দরখাস্তটি অনুসন্ধান ব্যতিত সরাসরি এফআইআর হিসেবে রাজধানীর গুলশান থানাকে গ্রহণের আদেশ দেন। ওই দিনই রাত ৯টা ২০ মিনিটে নালিশি দরখাস্তসহ আদেশের কপি গুলশান থানায় পাঠানাে হয় আদালত থেকে।

চার পৃষ্ঠার বিশাল ওই আদেশে বলা হয়েছে, নালিশি দরখাস্ত এফআইআর হিসেবে গণ্য করে আদেশ প্রাপ্তির ২৪ ঘন্টার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশােধিত ২০০৩) এর ৯ (১) (২)/৩০ তৎসহ দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারা অনুসারে তদন্তের জন্য মামলার নথি ডিআইজি, পুলিশ ব্যুরাে অব ইনভেস্টিগেশন, হেড কোয়াটার্স ঢাকা বরাবর প্রেরণ করবেন।

ঘটনা-৩: লালমনিরহাট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বাদি হয়ে তিন জন আসামির বিরুদ্ধে নালিশি দরখাস্ত দাখিল করেন একজন নারী (ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর: ২৩/২১)। পরে বাদির জবানবন্দি গ্রহণ করে অনুসন্ধান ব্যতিত বিচারক তারিক মাের্শেদ সিদ্দিকী গত ১০ জুন জেলার পাটগ্রাম থানাকে নালিশি দরখাস্তটি সরাসরি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।

আদেশে বলা হয়, আদেশের কপি প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে মামলাটি রেকর্ড সংক্রান্ত তথ্য ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করিতে নির্দেশ হইলাে।

উপরের এই তিনটি ঘটনা শুধু উদাহরণমাত্র। দেশের বিভিন্ন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে কিছু সংখ্যক বিচারক লাগাতার ভাবেই আইন লঙ্ঘন করে নালিশি দরখাস্ত মামলা হিসেবে গ্রহণের আদেশ দিচ্ছেন।
এর মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ২৭ ধারার লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

আইনের ২৭ ধারায় বলা হয়েছে-১ [(১) সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিম্নে নহে এমন কোন পুলিশ কর্মকর্তা বা এতদুদ্দেশ্যে সরকারের নিকট হইতে সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তির লিখিত রিপাের্ট ব্যতিরেকে কোন ট্রাইব্যুনাল কোন অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ করিবেন না। (১ক) কোন অভিযােগকারী উপ-ধারা (১) এর অধীন কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কোন অপরাধের অভিযােগ গ্রহণ করিবার জন্য অনুরােধ করিয়া ব্যর্থ হইয়াছেন মর্মে হলফনামা সহকারে ট্রাইব্যুনালের নিকট অভিযােগ দাখিল করিলে ট্রাইব্যুনাল অভিযােগকারীকে পরীক্ষা করিয়া-

(ক) সন্তুষ্ট হইলে অভিযােগটি অনুসন্ধানের (inquiry) জন্য কোন ম্যাজিষ্ট্রেট কিংবা অন্য কোন ব্যক্তিকে নির্দেশ প্রদান করিবেন এবং অনুসন্ধানের জন্য নির্দেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি অভিযােগটি অনুসন্ধান করিয়া সাত কার্য দিবসের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের নিকট রিপোর্ট প্রদান করিবেন; (খ) সন্তুষ্ট না হইলে অভিযােগটি সরাসরি নাকচ করিবেন।

(১খ) উপধারা (১) এর অধীন রিপাের্ট প্রাপ্তির পর কোন ট্রাইব্যুনাল যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে- (ক) অভিযােগকারী উপধারা (১) এর অধীন কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কোন অপরাধের অভিযােগ গ্রহণ করিবার জন্য অনুরােধ করিয়া ব্যর্থ হইয়াছেন এবং অভিযােগের সমর্থনে প্রাথমিক সাক্ষ্য প্রমাণ আছে সেই ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল উক্ত রিপাের্ট ও অভিযােগের ভিত্তিতে অপরাধটি বিচারার্থ গ্রহণ করিবেন; (খ) অভিযােগকারী উপ-ধারা (১) এর অধীন কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কোন অপরাধের অভিযােগ গ্রহণ করিবার জন্য অনুরােধ করিয়া ব্যর্থ হইয়াছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া যায় নাই কিংবা অভিযােগের সমর্থনে কোন প্রাথমিক সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নাই সেই ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল অভিযােগটি নাকচ করিবেন।

(১গ) উপ-ধারা (১) এবং (১ক) এর অধীন প্রাপ্ত রিপাের্টে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযােগ বা তৎসম্পর্কে কার্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ না থাকা সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল, যথাযথ এবং ন্যায় বিচারের স্বার্থে প্রয়ােজনীয় মনে করিলে, কারণ উল্লেখপূর্বক উক্ত ব্যক্তির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ করিতে পারিবেন।]

এ বিষয়ে সাবেক বিচারক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ফৌজদারী আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিষ্ঠিত নারী ও শিশু নির্যতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলােতে নারী ও শিশু নির্যতন দমন আইন ২০০০ এর ২৭ ধারার অধীনে সংশ্লিষ্ট অভিযােগকারীগণ অভিযােগ আনয়ন করিলে ট্রাইব্যুনালগুলাে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়েরকৃত অভিযােগ অনুসন্ধানের জন্য কোন ম্যাজিস্ট্রেট, বিশেষ করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা অন্য কোন ব্যক্তিকে নির্দেশ প্রদান করেন। এ ধরনের আদেশ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এই ধরনের আদেশের কথা উক্ত আইনের ২৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে বেশ কিছু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল হতে আমলে গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের মতাে দাখিলকৃত অভিযােগগুলােতে (নালিশ) এজাহার হিসেবে গণ্য করার জন্য আদেশ দিচ্ছেন। এই বিষয়টি নারী ও শিশু নির্যতন দমন আইন ২০০০ এর ২৭ ধারার বিপরীত। নারী ও শিশু নির্যতন দমন আইন ২০০০ এর ২৭ ধারা, ২৫ ধারা এবং ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডার ২০০৯ এর অধীনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল একজন আমলে গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটের মতাে কোন অভিযােগকে এজাহার হিসেবে গণ্য করার আদেশ দিতে পারেন না, যেমন পারেন না দায়রা আদালত। কেন না ওই ট্রাইব্যুনালও দায়রা আদালতের মতাে বিচারিক কার্যক্রমে সমতুল্য।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »