বটিয়াঘাটা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

বটিয়াঘাটা (খুলনা) থেকে শাহিন বিশ্বাস »

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

খুলনার বটিয়াঘাটা পল্লীতে বছর যেতে না যেতেই ভেঙ্গে পড়ল অর্ধশত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর।

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নে অবস্থিত মাথাভাঙ্গায় এই আশ্রয়ণণ প্রকল্প। এখানে সরকারিভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়া হয়েছে ২ শত পরিবারকে। লোক সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এক বছর যেতে না যেতেই ভেঙ্গে পড়লো আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্ধশত ঘর।

ঠিকাদারের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই আজ আশ্রয়ণ প্রকল্পের গৃহহীন জনগোষ্ঠীর মানুষ মানবতর জীবন যাপন করছে। যেকোন সময় তাদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর অনিয়ম-দুর্নীতির মধ্যে নিম্নমানের ইট, বালু, রড, সিমেন্ট, খোয়া দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

মাথাভাঙ্গা এলাকার সেসব গৃহহীন পরিবারগুলো অভিযোগ করে এ প্রতিনিধিকে জানান, বছর যেতে না যেতেই ২ শত ঘরের মধ্যে ৪২টি ঘর একেবারেই ভেঙ্গে ধসে পড়েছে। বৃষ্টি হলেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের গলিতে হাঁটু পানি জমে যায়। আমাদের বের হবার কোন পথ নেই। সরকারের দেওয়া এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়ে আমরা খুশি হলেও রাত হলেই আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাতে ঘুমাতে ভয় পাই। মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যেই আঁতকে উঠি-কখন যেন ঘর ভেঙ্গে মাথার উপর পড়ে। বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলেও কোন সমাধান পাইনি।

অনেকে আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে অন্যত্র চলে গিয়ে ঘর ভাড়া করে বসবাস করছে। গতকাল এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভেঙ্গে যাওয়া আশ্রয়ণহীন পরিবারের করুন কাহিনী। ক্যামেরার সামনেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে তারা। শুধু তাই নয়, নানাবিধ অভিযোগ তুলে ধরেন তারা।

এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নিতে তাদেরকে গুনতে হয়েছে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির মধ্যে দিয়ে ভূমিহীনদের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ কাজ শেষ করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এই অনিয়ম দুর্নীতির সাথে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন উপজেলার নিবার্হী কর্মকর্তা, সরকারি সার্ভেয়ার, ভূমি অফিসের নায়েব।

লাকি বেগম, বাড়ি বরিশাল। পেশায় একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। তিনি বলেন, আমি ঢাকার একটি গার্মেন্টেসে চাকরি করতাম। সেখান থেকে এসে জনৈক এক ব্যক্তির মাধ্যমে বটিয়াঘাটা উপজেলার ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার সাকিরুনকে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে আমি ঘরটি কিনে নেই।

এছাড়াও এই দূর্নীতির সাথে জড়িত রয়েছে তৎকালীন জলমা ভুমি অফিসের কানুনগো। বতর্মান তিনি সুরখালী ভূমি অফিসে কর্মরত আছেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের বিষয় উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আশরাফুর আলম খানের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘর নির্মাণে এতোই অনিয়ম দৃর্নীতি হয়েছে যে ভাষায় প্রকাশ করা যায়না না! ইট, বালু, সিমেন্টসহ যাবতীয় মালামাল সিডিউল মোতাবেক না দেওয়ার কারনে আজ ঘরগুলো ভেঙ্গে পড়েছে। আমি নিজেই গিয়ে দেখে আসছি। বাকি ঘরগুলোর অবস্থা ভালো না। সেখানে বসবাস করার মত কোন পরিবেশ নেই, অত্যন্ত নাজুক অবস্থা যা স্বচক্ষে না দেখলে ধারনাই করা যাবে না যে ঘরগুলো বসবাসের জন্য কতোটা অনুপোযোগী।

অন্যদিকে উপজেলার বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোঃ ইমদাদুল হক বলেন, ঘর নির্মণের সময় আমি ছিলাম না। তাই ঐ বিষয় আমি কিছু বলতে পারব না। এ বিষয় ইউএনও স্যার ভালো বলতে পারবেন। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আইলায় ঘরগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ঘর নির্মাণের বরাদ্দ চেয়ে পাঠানো হয়েছে, বরাদ্দ পেলে অচীরেই ঘরগুলো সংস্কার করা হবে।

ঘর নির্মাণের সাথে জড়িত উপজেলার সরকারি সার্ভেয়ার মোহাম্মদ সাকিরুল এর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ ঘর নির্মাণের অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত সবাই নিজেদের অপকর্ম ঢাকা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কলাকৌশল এর আশ্রয় নিয়েছে এবং বিভিন্ন মহলে ইতোমধ্যে দৌড়ঝাঁপ দিতে শুরু করেছেন।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের এইরকম শতাধিক ব্যক্তিরা বলেন, আমাদের সবাইকে টাকার বিনিময়ে ঘর নিতে হয়েছে। মোমেনা বেগম ঘর নম্বর ৪২, লিটন গাজী ঘর নং ৪৭, হাফিজা বেগম ঘর নম্বর ৪৩, সবুর গাজী ঘর নম্বর ৪৮, সোবান কাজী ঘর নম্বর ৪৯, লাকি বেগম ঘর নম্বর ১৪, নুপুর বেগম নম্বর ২৫, বিউটি বেগম ঘর নম্বর ২৪, জাহাঙ্গীর খান ঘর নম্বর ২৭,জোহরা খাতুন ঘর নম্বর ২৬, কুলসুম বেগম নম্বর ২৮, জোবায়ের ঘর নম্বর ২০, মিলন আকন ঘর নম্বর ৫৭,হাফিজ শেখ ঘর নম্বর ১৮,সহ শতাধিক ভুক্তভোগী পরিবার বলেন,আমরা সবাই চরম সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়েছি।

কালাম খান ও ফজলু গাজী বলেন, দুই শত ঘরের মধ্যে ৪০/৫০ টি ঘর ভেঙ্গে গেছে। বাকি ঘরগুলোর অবস্থা বেশি ভালো না। যেকোন সময় একটু ভারী বাতাস হলে ভেঙ্গে পড়বে। তাছাড়া এখানে রয়েছে খাবার পানির তীব্র সংকট। সরকারি অধিকাংশ টিউবওয়েলের অবস্থা ভালো না। বেশীরভাগ সময় সেগুলো নষ্টই থাকে। যে কল কয়টি ভালো আছে সেটায়ও প্রচুর আয়রণ থাকায় পান করা যায়না। একটু বৃষ্টি হলেই গলির ভেতর পানি জমে যায়। পানি সরবরাহের কোন পথ নাই। ফলে বর্ষার সময় পানিবন্দি হতে হয় সকলকে। এখানে লোক সংখ্যা প্রায় এক হাজারের বেশি। এখানে রয়েছে একটি অফিস ঘর। সেটাও দীর্ঘ একবছর ধরে তালাবদ্ধ হয়ে আছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভুক্তভোগী পরিবাররা অবিলম্বে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যাহাতে তারা বর্তমান সরকারের দেওয়া ঘর নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »