নিষেধাজ্ঞায় চরম সংকটে বরগুনার জেলেরা

বরগুনা থেকে মো. মাহাবুব আলম »

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বঙ্গোপসাগরে ৬৫ দিনের মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞার কারণে বরগুনার জেলেপল্লীর সদস্যরা রয়েছেন চরম সংকটে। ঋণ, ধার-দেনা ও দাদনের জালে আটকে বহু কষ্টে জীবনযাপন করছেন সমুদ্র উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়।

প্রজনন, উৎপাদন, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং টেকসই মৎস্য আহরণের জন্য গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিনের জন্য সমুদ্রে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। দীর্ঘদিন যাবত বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় লোনা পানি বিদ্যমান থাকায় মৎস্য সংকটের অভাবে দিশেহারা জেলে পরিবারগুলো।

খাদ্য সহায়তা হিসেবে জেলেদের দেয়া হয়েছে চাল। প্রতি জেলে পরিবার ইতোমধ্যে সরকারি সহায়তা পেয়েছেন ৫৬ কেজি করে শুধুমাত্র চাল। মাত্র ৮ ৬০ গ্রাম চাল একটা জেলে পরিবারের একদিনের জন্য। যা গড়ে পাঁচ সদস্যের জেলে পরিবারের জন্য নিতান্তই অপ্রতুল।

মহামারি করোনার কারণে বিকল্প কোন কর্ম না থাকায় শুধু চাল নয়, চালের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার দাবি করছেন জেলেরা। অসংখ্য জেলে এখনো নিবন্ধনের তালিকায় না আসায় বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি সহায়তা থেকে। ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না ক্ষতিগ্রস্ত জেলে ও ট্রলার মালিকরা।

বরাবরের মতো এবারও ট্রলার মালিক ও জেলেদের অভিযোগ ভারত ও বাংলাদেশে একই সময় নিষেধাজ্ঞা না থাকায় বিগত সময়ের মতো বাংলাদেশের জল সীমায় ঢুকে মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় জেলেরা।

সমুদ্রে মৎস্য শিকার নিষেধাজ্ঞা থাকায় বরগুনার পাথরঘাটায় বলেশ্বর থেকে বিষখালী নদীর ভারানি খালের দু’পাড়ে শত শত ট্রলার নোঙ্গর করে রাখা হয়েছে। সমুদ্রগামী জেলেরা হয়ে পড়েছেন বেকার। মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রসাররোধে দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন, ৯৫ শতাংশ জেলের মাথায় ঋণের বোঝা, রোজগারে টানাপোড়েন, পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালানোর হতাশার ছাপ বিরাজ করছে জেলেদের চোখ মুখে।

জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ইলিশের মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু মৌসুমের অর্ধেক সময়ই আটকে যায় নিষেধাজ্ঞায়।

উপকূলীয় সমুদ্রগামী জেলে ও ট্রলার মালিকরা বলছেন, ‘৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার এ দীর্ঘ সময়ের জন্য সরকার থেকে প্রতি পরিবারের জন্য মাত্র ৫৬ কেজি চাল প্রদান করা হয়েছে। যা একটা জেলে পরিবারের জন্য খুবই অপ্রতুল। কোন আর্থিক সহায়তা না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন জেলেরা।’

তারা আরও বলছেন, ‘ঋণ, দাদন, ধার দেনা ইত্যাদির প্রভাবে এ অবরোধ মানতে চাচ্ছে না উপকূলীয় এলাকার জেলেরা। ভারত-বাংলাদেশ একই সময়ে সমুদ্রে মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা না থাকায় বাংলাদেশের জল সীমানায় এসে মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে।’

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার অর্ধশতাধিক জেলেপাড়ায় আট হাজার ২২৭টি জেলে পরিবারের ৩৭ হাজার ২২ জন সদস্য রয়েছে। এ সময়ে উপকূলীয় এলাকার জেলেদের জন্য বিশেষ খাদ্য সহায়তার স্বল্প পরিমাণের চাল প্রদানের বিষয়টি খুবই অপ্রতুল বলে মনে করছেন জেলেরা। জেলেদের অধিকাংশের নিবন্ধন না থাকায় বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি খাদ্য সহায়তা থেকে। দীর্ঘ কর্মহীনতায় অনিবন্ধিত জেলেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।

সরেজমিনে বিভিন্ন মৎস্য পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকা সাগর ও নদ-নদী ঘেষা জনপদের বেশির ভাগ পরিবার জেলে। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ইলিশ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থে জেলেরা নৌকা ডাঙ্গায় তুলে রেখেছেন।

বিভিন্ন ঘাটে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরাদ্দকৃত চাল দিয়ে তিন বেলা খাওয়া সম্ভব নয় বিধায় জেলেরা বাধ্য হয়ে নদীতে নামছেন মাছ শিকারে। এমন দুর্দশার সুযোগ নিয়ে কিছু সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী জেলেদের উৎসাহিত করছেন সাগরে মাছ শিকার করতে। ফলে পরিবারের খাদ্যের যোগান দিতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গোপনে মৎস্য শিকারে যাচ্ছেন অনেক জেলে।

জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ক্ষতিগ্রস্ত ট্রলার মালিক ও জেলেদের ঋণ সহায়তার দাবি জানান।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, জেলায় মোট নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৩৬ হাজার ২২ জন। তার মধ্যে সমুদ্রগামী ২৭ হাজার ২৭৭ জেলে পাবেন খাদ্য সহায়তা ৮৬ কেজি করে চাল।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »