নবীগঞ্জের নোয়াগাঁও গ্রামে আগের দিন হামলার সিদ্ধান্ত পরদিন কার্যকর

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) থেকে মো. সেলিম উদ্দিন »

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নবীগঞ্জ উপজেলার পানিউমদা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় সরেজমিন অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ঘটনার আগেরদিন সাতাইহাল ৬ মৌজার মিটিংয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের লোকজনকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিষয়টি আগে থেকেই অবগত ছিল প্রশাসন। নোয়াগাঁও গ্রামের তান্ডবে সাতাইহাল ৬ মৌজার লোকজনের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে নেয়া হয় কঠোর সিদ্ধান্ত। ৬ মৌজার কেউ না গেলে পঞ্চায়েতের বিধি অনুযায়ী জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আগেরদিনের মিটিংয়ে। এ জরিমানার পরিমান ১২ হাজার টাকা বলে ওই এলাকার অনেকের সাথে আলাপ করে জানা যায়।

৬ মৌজার একাধিক লোকজনের সাথে আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকরা জানা যায়, গত শনিবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের ফুলতলী বাজারে সাতাইহাল ৬ মৌজার এক জরুরী মিটিং আহবান করা হয়। মিটিংয়ে গজনাইপুর ইউনিয়নের বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি ইমদাদুর রহমান মুকুলও উপস্থিত ছিলেন।

মিটিংয়ে মুক্তিযোদ্ধা নুর উদ্দিন তার বক্তব্যে, গত (২৬ মে) রাতে পানিউমদা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের রোক্কা বিলের পার্শ্ববর্তী অবস্থিত তার ব্যক্তি মালিকানাধীন ফিশারির পাহাড়াদার আবুল মিয়া ও তার স্ত্রী জারু বেগমকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার ঘটনা ও পরবর্তীতে থানায় মামলা দায়েরর বিষয়টি অবহিত করেন। আলোচনা সাপেক্ষে মিটিং এর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন ইমদাদুর রহমান মুকুল।

সিদ্ধান্ত হয়, রোববার (৩০ মে) সকালে ৬ মৌজার সকল লোকজন একত্রিত হয়ে নোয়াগাঁও’র হাওড়ে গিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের উচ্ছেদ করা হবে। ৬ মৌজার কেউ এই উচ্ছেদে না গেলে পঞ্চায়েতের বিধি অনুযায়ী জরিমানা করারও সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া মিটিং এর কোনো সিদ্ধান্ত ৬ মৌজার বাহিরের কাউকে জানালে আর্থিক জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়।

অন্যদিকে (২৯ মে) রাতেই সাতাইহাল ৬ মৌজা কর্তৃক সহিংসতার সিদ্ধান্তের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আইনশৃংখলা বাহিনীর উর্ধতন কর্তকর্তাদের অবগত করেন পানিউমদা ইউনিয়নের নেতৃত্ব স্থানীয় লোকজন।

পরদিন রোববার (৩০ মে) সকালে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মহি উদ্দিন ও নবীগঞ্জ থানার ওসি মো. ডালিম আহমেদ বিপুল সংখ্যক পুলিশসহ সাতাইহাল গ্রামে গিয়ে নেতৃত্ব স্থানীয়দের সহিংসতায় না জড়াতে অনুরোধ করেন। গ্রাম্য মাতব্বরদের সাথে আলোচনা চলাকালেই পাশকাটিয়ে ৬ মৌজার লোকজন নোয়াগাঁও হাওড়ে বসবাসকারীদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করে। বিষয়টি অবগত হবার সাথে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা র‌্যাব-পুলিশ নিয়ে নোয়াগাঁও’র হাওড়ে ছুটে যান। ততক্ষণে ১৩টি ঘর ভস্মীভূত হয়ে যায়। শুরু হয় অসহায় মানুষের আহাজারী। সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে মাটিতে লুটে পড়ে নিরপরাধ অসহায় মানুষ। ক্ষতিগ্রস্থদের আহাজারিতে এক মানবেতর দৃশ্যের অবতারণ হয়। লুট করে নিয়ে যাওয়া হয় ধান, ঘরের আসবাবপত্রসহ অনেক জিনিস। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্থদের টিন, নগদ অর্থ, চাল ও খাদ্য সামগ্রী দেয়া হয়।

এ ঘটনায় ১ জুন নোয়াগাঁও গ্রামের আব্দুস শহীদের ছেলে জামাল হোসাইন বাদী হয়ে নুর উদ্দিন (বীরপ্রতিক), গজনাইপুর ইউনিয়নের বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি ইমদাদুর রহমান মুকুলসহ ৪৭জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ২০০-২৫০ জনকে অভিযুক্ত করে নবীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারেও গত (২৯ মে) শনিবার রাতের সাতাইহাল ছয়মৌজার মিটিংয়ে ইমদাদুর মুকুলের নির্দেশে নোয়াগাঁও গ্রামের হামলা করার হয় বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ওই হামলায় আগুণে পুড়ে প্রায় ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকার মালামাল আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করা হয় এবং ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৬শত টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনার পর তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে গজনাইপুর ইউনিয়নের বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুলসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে আইন শৃংখলা বাহিনী।

এ প্রসঙ্গে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মহি উদ্দিন বলেন, বিষয়টি পূর্বে অবগত হয়ে আমরা (৩০ মে) সকালে সাতাইহাল হায়রাঘাটে পৌঁছি। কিন্তু ভোর থেকেই সাতাইহাল ৬ মৌজার দুষ্কৃতিকারী লোকজন নোয়াগাঁও গ্রামের হাওড়ে যেতে শুরু করে। আমরা সেখানে পৌঁছে স্থানীয় মুরুব্বিয়ানদেরকে আহবান করি তাদের লোকজনকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং মাইকিংও করা হয়। তখন সেখানে উপস্থিত নেতৃস্থানীয় লোকজন প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেন যে, ৬ মৌজার মানুষ কোনো ধরণের সহিংসতায় যাবেনা এবং ফিরে আসবে। তাদের আশ্বাসের পরও এরকম ঘটনা ঘটলো এটা সত্যিই দুঃখজনক। যে বা যারা এই ঘটনার সাথে জড়িত অবশ্যই তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

ইউএনও বলেন, ৬ মৌজার মিটিংয়ে (৩০মে) সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে যদি কেউ না যায় তাহলে তাকে জরিমানা করা হবে বলে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিষয়টি আমি ঘটনার পরবর্তীতে খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে অবগত হয়েছি।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »