পর্যটনশিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রয়োজন

মেহেদী হাসান »

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সমগ্র পৃথিবী যখন করোনার ভয়াল থাবায় কাবু তখন অন্যান্য সেক্টরে মত ধাক্কা খেয়ে বেসামাল হয়ে আছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সকল সেক্টর। হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, বিমান, নৌ ও ট্রাভেল এজেন্সি, বুকিং ইঞ্জিন থেকে শুরু করে সকল সেক্টরেই লেগেছে ধাক্কা। এই ধাক্কা সামাল দিতে কত দিন লেগে যাবে তা বলা মুশকিল।

২০১৯ এর সমীক্ষা অনুযায়ী, সমগ্র পৃথিবীতে প্রায় ১৯ কোটি মানুষ ভ্রমণ করে বেড়ায়। ২০২০ সালে তা ১৬০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে বলে ধরা হয়েছিল।

কিন্তু এই মহামারী করোনার প্রভাবে এই সকল পর্যটন পরিসংখ্যান আর সম্ভাবনার সব কিছু আজ কাগজে কলমে বন্দি হয়ে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে এশিয়ার টুরিস্টের সংখ্যাই ছিল ৭৫ শতাংশ।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার সূত্র মতে, ২০১৮ সালে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ কর্মরত ছিল এই পর্যটন শিল্পে, এখন সময়ের তাগিদে পেশা বদল করেও নাজেহাল পর্যটনের পেশাজীবীরা।

সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী পর্যটনের পেশাজীবীদের মতো বেসামাল অবস্থায় আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিনকে দিন আভ্যন্তরীণ ট্যুরিজম, একটি ব্যাপক প্রসারমান ব্যবসা-বাণিজ্যে পরিণত হতে চলেছিল।

পর্যটনের সূত্র মতে, যে দেশের আভ্যন্তরীণ ট্যুরিজম সুন্দর অবকাঠামোতে দাঁড়িয়ে যাবে সেখানে বিদেশী পর্যটকদের আগমন ঘটতে থাকবে ব্যাপক ভাবে। বস্তুত বাংলাদেশ ইনবাউন্ড ট্যুরিজম ২০১৩ সালে একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেসামাল এবং শূণ্যের কোঠায় নেমে গিয়েছিল। সেখান থেকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের একটা চমৎকার ক্ষেত্র তৈরি হতে চলেছিল। যার ফলে পর্যটন উদ্যোক্তারাও দিনের-পর-দিন সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছিল।

সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের আউটবাউন্ড ট্যুর এবং ইনবাউন্ড ট্যুরের একটি বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছিল। ধীরে ধীরে এই আভ্যন্তরীণ পর্যটনের ক্ষেত্রটি সম্প্রসারিত হয়ে সমগ্র দেশের জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল।

দেখা গেছে, বাংলাদেশের ট্যুরিস্টরা দক্ষিণ এশিয়ার তথা সমগ্র এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ছাড়াও ইউরোপ আমেরিকায় একটি বড় অংশ তাদের ভ্রমণ পিপাসা মেটাতে উদগ্রীব হতে শুরু করেছিল। অপ্রিয় হলেও সত্য পোশাক শিল্পের মতো বাংলাদেশ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একটি বিশেষ স্তরে প্রবেশ করতে যাওয়া ঠিক আগ মুহূর্তে বৈশ্বিক মহামারী করোনার ভয়াল থাবা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে বাংলাদেশের সকল নতুন উদ্যোক্তাদের। বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান পর্যটন কর্পোরেশন তার কিছু প্রথাগত দায়িত্ব পালন এই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কর্মকাণ্ডে।

যখন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পর্যটন বিকাশে নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছিল ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসেছিল বাংলাদেশের পর্যটন কর্পোরেশন। সেই নড়েচড়ে বসার কারণে ২০১০ সালে গঠিত হয় পর্যটন বোর্ড। যার কর্মকাণ্ড তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। যদিও হাজার ১৯৯৯ সালে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করা হলেও তার যথাযথ ব্র্যান্ডিং অথবা প্রমোশন দেশব্যাপী তেমন কারো চোখে পড়েনি।যা শুধু সীমাবদ্ধ ছিল রাজধানীর মধ্যেই।

ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে ২০১৫ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা শুরু হয় এই পর্যটন বিকাশের সমস্ত কর্মকাণ্ডের এবং সেখানেই নড়েচড়ে বসে পর্যটন কর্পোরেশন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সকল বিভাগ। যার ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সালে আবার ঘোষিত হয় পর্যটন বর্ষ এই পর্যটন বর্ষকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যটন বোর্ড সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাপক প্রচার প্রচারণায় নেমে তার ক্যাম্পেইন করে একটা সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেবার চেষ্টা করেন।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (বিইউটিটিসি) তাদের ২০১৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বিশ্বের যে ২০ দেশ পর্যটন শিল্পে আগামী সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

আমাদের এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর যার নিজস্ব কোন রিসোর্স নেই বললেই চলে তবুও তাদের নিজের তৈরি করা অবকাঠামো দিয়ে তাদের দেশের জাতীয় আয় করে থাকে। এ পর্যন্ত দেখা গেছে জাতীয় আয়ের ৬৫ শতাংশ, হংকংয়ের ৫০ শতাংশ, ফিলিপিনের ৫০ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের ৪০ শতাংশ এই পর্যটন খাত থেকে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মালদ্বীপ, শ্রীলংকা এবং সুইজারল্যান্ড, ভুটান পর্যটন শিল্পে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অবস্থানে রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত তাদের প্রতিটি প্রদেশকে সমগ্র বিশ্বে তুলে ধরার জন্য আলাদা আলাদা প্রাদেশিক পর্যটন বোর্ড গঠন করে নিজস্ব ভাবে ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করে সমগ্র বিশ্বের পর্যটকদের আকৃষ্ট করে চলেছে। তারা তাদের জাতীয় আয়ের ২৫ শতাংশ এই পর্যটন খাত থেকে তুলে নিয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের আগামী বছরগুলোতে লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশ দিকে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে তার মজবুত ভিত্তিমূলে ছিল ব্যক্তিগত উদ্যোক্তারা। তবে তার পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে যেমন বাংলাদেশের তথা বিশ্বের সর্বোচ্চ লম্বা সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারকে নিয়ে বর্তমান সরকারের যে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা তার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হচ্ছে মেরিন-ড্রাইভ-রোড। যা চোখে পড়ার মতো এক বিশাল অবস্থান দখল করেছে দেশিয় পর্যটকদের কাছে। পাশাপাশি নতুন ভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন রকম বনাঞ্চল তথা সরকারি উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এই অঞ্চলের নীলাচল, নীলগিরি, কাপ্তাই ও সাজেক উল্লেখ করার মতো।

বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সমন্বয় সাধিত হলে বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে জাতীয় আয়ের একটি সহায়ক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বর্তমান এই সম্ভাবনার সেক্টরটিকে মহামারী করোনা অনেকটা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেছে। বিশেষ করে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের পর্যটন খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির অনিশ্চয়তা সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে।

সরকারের সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যে প্রদর্শিত হয়েছে তার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া একটা জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রণোদনাকে সঠিক বাস্তবায়নের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা এবং তদারকি বিশেষ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পর্যটনশিল্পকে এই করোনাকালীন বিশেষ প্রণোদনার আওতায় না আনলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হবে। তার পাশাপাশি বেকার সমস্যা সমাধানের এই পর্যটন শিল্প যে ভূমিকা রেখেছিল সেখানেও একটি বড় রকম ধাক্কা খাবে বলে পর্যটন বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

তাই এ মুহূর্তে পর্যটনবান্ধব সবাইকে নিয়ে একটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

পর্যটন বিষয়ক উদ্যোক্তা ও সাধারণ সম্পাদক গাজীপুর সিটি প্রেস ক্লাব।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »