চট্টগ্রাম ‘দেখে’ ঢাকায় ভয়ে বিএনপি

অনলাইন ডেস্ক »

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অনলাইন ডেস্ক:
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতেও চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনেছে বিএনপি। তারা আশঙ্কা করছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ইভিএম জালিয়াতি করা হবে। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচন ঢাকার জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আগাম বার্তা। এ নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে থাকা নেতারাও বেশ চাপে পড়েছেন।

নির্বাচনে যাওয়ার বিপক্ষের নেতারা বলছেন, আমরা বিষ খেয়ে বিষ হজম করছি। নির্বাচনে গেলে বলেন কেন নির্বাচনে গেলাম; না গেলে এ নিয়ে টেলিভিশনে টকশো, পত্রপত্রিকায় নানা সমালোচনা শুরু হয়। যদিও নির্বাচনে থাকা নেতারা বলছেন, তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো পদ্ধতিতেই কাজ হবে না। নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোট না হলে ভোট সুষ্ঠু হবে না। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম উপনির্বাচনের মতো ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচন অনিয়মের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচনে আর অংশ না নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। যদিও এ নিয়ে এখনো পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, চট্টগ্রামে উপনির্বাচন হয়েছে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতেই দেয়নি। তার আগে বোমা মেরে লাঠিসোটা দিয়ে ভোটারদের তাড়িয়ে দিয়েছে। তার পর জিজ্ঞেস করেন, আপনারা (বিএনপি) পারেননি।

পারব কোত্থেকে? যে গুণ্ডা লাঠি মারে সন্ত্রাসী করে, তার সঙ্গে সাধারণ মানুষরা পারবে কোত্থেকে। এটাই প্রকৃত সত্য। যারা ভোটার তারা তো মারামারি করে না। তারা তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে যায়, সেটা প্রয়োগ করতে দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, তার পরও বলি, হতাশ হবেন না, ছেড়ে দেবেন না। যত কষ্ট আসুক, যত যন্ত্রণা আসুক, যত অত্যাচার লাঞ্ছনা আসুক এ দেশের মানুষ বারবার উঠে দাঁড়িয়েছে, তরুণরা উঠে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়াবে, দাঁড়াচ্ছে। সব জায়গায় প্রতিরোধ হচ্ছে, প্রতিরোধ হবে।

চট্টগ্রাম-৮ আসনের নির্বাচনের প্রভাব সিটি নির্বাচনে পড়বে কিনা-জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এই আশঙ্কার কথা আগে থেকেই বারবার বলে আসছে বিএনপি। সিটি নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা যাবে এমন আশঙ্কার কথাও আগেই বলা হয়েছে। মোট কথা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে। তার পরও বিএনপি চেষ্টা করছে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে। বিএনপি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে ১৭০টি কেন্দ্রের ১ হাজার ১৯৬টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ হয় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএমে। ভোট শুরু হওয়ার দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে সব কেন্দ্র থেকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রের ৬০-৭০ গজ দূরে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা গলায় নৌকা প্রতীকের কার্ড ঝুলিয়ে পাহারা দিয়েছেন। বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে তারা ভোটারদের প্রশ্নও করেন। মনঃপুত জবাব না হলে ভোট না দিয়ে অনেককেই ফিরে যেতে হয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে তাকে শেষ পর্যন্ত থাকতে হয়েছে।

দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের যুক্তি-প্রতিপক্ষ ভোট কারচুপি কী কী কৌশল অবলম্বন করে তা প্রত্যক্ষ করতে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রমাণ রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের উপনির্বাচনে প্রায় সব কেন্দ্র সরকারি দল দখল করে নিয়েছে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতির মাধ্যমে এবং ইভিএমের মাধ্যমে তারা সন্দুরভাবে ভোট নিয়ে গেছে। ভোটার ভোট দিক আর না দিক-সরকারি দল ভোটকেন্দ্র দখল করে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হয়েছে। ঢাকায়ও একই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রচারের সময় গ্রেপ্তার করবে না বলেছে। নির্বাচন কমিশনে আমি নিজে গিয়েছিলাম। আমাকে ইসি ওয়াদা করেছে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তার হবে না, কোনো অভিযান চলবে না। গ্রেপ্তারও চলছে, অভিযানও চলছে, আক্রমণ চলছে, হামলা চলছে এবং হামলার মাধ্যমে একটা ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিএনপির পুরনো অভ্যাস। চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচন নিয়েও তারা ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছে। বাস্তবে সেখানকার মানুষ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীকে দল-মত নির্বিশেষে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে। সুতরাং নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি এ কথা মোটেও সত্য নয়। এই অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

স্বাভাবিকভাবে প্রচারে অংশ নিতে পারছেন নাকি পুলিশি হয়রানি রয়েছে, এর জবাবে উত্তরের মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেন, বিভিন্নভাবে বাধার মধ্যেও নেতাকর্মীরা দিনের বেলায় স্বাভাবিকভাবে প্রচারে অংশগ্রহণ করতে পারছেন। যখনই আমরা প্রচার বন্ধ করে দিই, রাতের পর রাত ওনাদের বাসায় খোঁজখবর নিচ্ছে, কখনো ইউনিফরম পরে, কখনো সাদা পোশাকে। নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে কিছু নেই। শত বাধার পরও বিএনপি নেতাকর্মীরা শান্ত আছেন। তারা যতই উসকানি দিক আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মাঠে আছি, থাকব।

দক্ষিণের বিএনপির মেয়রপ্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন অভিযোগ করেন, ধানের শীষের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। যারা পোস্টার লাগাতে যাচ্ছে তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে, মারধর করা হচ্ছে। এমনও হুমকি দেওয়া হচ্ছে পোস্টার লাগাতে এলে থানা পুলিশে দেবে। পোস্টার লাগানো কি অপরাধ? তা হলে কেন থানা পুলিশ হুমকি দেবে?

নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা নিজের কেরামতি অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনের মাধ্যমে ৩০ জানুয়ারি ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগাম বার্তা দেওয়া হলো কিনা, জনগণ সেটি জানতে চায়। ঢাকার নির্বাচনেও তারা একই ঘটনার আশঙ্কা করছেন।

চট্টগ্রাম উপনির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি-বিএনপির এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হলেই তারা বলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি।

যারা মাগুরা উপনির্বাচনের মতো ঘটনা ঘটায়, যারা ২০০১ সালে ফালুকে কারচুপি করে জয়ী করে, যারা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পদবাণিজ্য করে তাদের মুখে এসব কথা মানায় না। আমরা মনে করি স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করছে নির্বাচন কমিশন। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনের আসন্ন দুই সিটির নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইভিএমের ওপর মানুষের আস্থা নেই। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার কাছে ভোটারের অনুপস্থিতিতে ভোট প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনেও ছিল। মানুষ এটা জানেন। সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন ও ইভিএমের ওপর মানুষের আস্থাহীনতার কারণে কেন্দ্রে যেতে চান না। ঢাকা সিটি নির্বাচনেও তার পুনারাবৃত্তি ঘটবে বলে মনে করেন তিনি।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »